পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতির বিষয়টি তোয়াক্কা না করেই একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের ছয় কিলোমিটার অংশ নির্মাণে ১৫টির বেশি পাহাড় কেটেছে সংস্থাটি। শুধু তা-ই নয়, এই পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল বা খাড়াভাবে কাটা হয়েছে এসব পাহাড়। এতে যেকোনো সময় পাহাড় ধসে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সড়কে।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এবং বহিঃসীমা দিয়ে লুপরোড নির্মাণসহ ট্রাংক রোড থেকে বায়েজিদ বোস্তামী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ’ প্রকল্পটি ১৯৯৭ সালে হাতে নেয় সিডিএ। সময়মতো শেষ করতে না পারায় নতুন করে ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয় প্রকল্পের সময়সীমা। এতে ৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পেও ব্যয় বেড়ে ৩২০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় পেলেও পাহাড় কাটার নিরাপদ ধরনই নিশ্চিত করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিডিএর এ প্রকল্পে দক্ষিণ সলিমপুর মৌজা, জঙ্গল লতিফপুর মৌজা, জঙ্গল সলিমপুর মৌজা, জালালাবাদ মৌজা ও উত্তর পাহাড়তলী মৌজার প্রায় সাড়ে ১৫ একর জমির মধ্যে সাড়ে ১৪ একরই পাহাড়। এ পাহাড় কেটে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেছে সিডিএ।
প্রকল্পটির জন্য জঙ্গল সলিমপুর, সলিমপুর ও জঙ্গল লতিফপুরেই কাটা পড়েছে ১০টি পাহাড়। এছাড়া পাঁচটি পাহাড় কাটা পড়ছে মহানগরের উত্তর পাহাড়তলীতে। এছাড়া কিছু ছোট পাহাড়ও কাটা পড়ে এ প্রকল্পে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ছয় কিলোমিটার রাস্তার জন্য ১৫ থেকে ১৭টি পাহাড় কাটা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে ১০টিরও বেশি পাহাড় থেকে মাটি ভেঙে সড়কের ওপরে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। পাহাড়ের মাটি আরো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সড়কের ওপর পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় চার লেন সড়কের এক পাশ যান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
সিডিএর এ প্রকল্পের কাজে খাড়াভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে এমন অভিযোগ শুনে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. একেএম রফিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি অনুমোদনের বাইরে পাহাড় কাটার প্রমাণ পান। পরে ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের এক শুনানিতে আড়াই লাখ ঘনফুটের বিপরীতে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৭০০ ঘনফুট মাটি কর্তন এবং খাড়াভাবে মাটি কাটার দায়ে সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করা হয়।
এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনিও নকশা না মেনে পাহাড় কাটার অভিযোগ তোলেন সিডিএর বিরুদ্ধে। মন্ত্রীর পরিদর্শনের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকেও ৫ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী বলেন, সিডিএ খাড়াভাবে পাহাড় কাটার কারণে এ সড়ক আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। সিডিএকে আমরা আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছি। সম্প্রতি সড়কের পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এসব পাহাড় থেকে সড়কের ওপরে ঝরে পড়ছে মাটি। সেটাও আমরা সরেজমিন গিয়ে দেখেছি। সেজন্য আমরা সিডিএকে সড়কটির এক পাশে বন্ধ করে রাখতে নির্দেশ দিয়েছি। যেহেতু সিডিএ কোনো নিয়ম না মেনেই অতিরিক্ত পাহাড় কেটেছে, সেজন্য রক্ষণাবেক্ষণ তাদেরই করতে হবে।
সিডিএ পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটার নতুন কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্ষা মৌসুম আসার আগে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটার প্রস্তাব দিয়েছিল সিডিএ। কিন্তু তাদের প্রস্তাব মেনে নিলে পাহাড়গুলোর অস্তিত্বই থাকবে না। সেজন্য আমরা সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি।
এখন ঝুঁকিপূর্ণ এ পাহাড়গুলো সংরক্ষণে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সিডিএ যৌথ সমীক্ষা চালিয়ে পাহাড় কাটার ধরন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে আলাদাভাবে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে এমন কোনো কাজে পরিবেশ অধিদপ্তর সমর্থন দেবে না বলেও জানান তিনি।
ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে জেনেও কেন এভাবে পাহাড় কাটা হলো, এমন প্রশ্নের উত্তরে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, আমরা সিডিএর পক্ষ থেকে আগের নির্দেশনা অনুযায়ী পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণে কাজ করছিলাম। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর বড় অংকের জরিমানা করায় তখন আর কোনো কাজ করতে পারিনি। পাহাড়গুলো এখন যে অবস্থায় আছে সেগুলো ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে প্রস্তাব দিয়েছিলাম।
কারণ ১:২ অনুপাতে পাহাড় কাটা হলে বেশি পরিমাণে কাটা পড়বে পাহাড়। ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটলে পাহাড় কম কাটা পড়বে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি না পাওয়ায় পাহাড় কাটার নিরাপদ ধরনই ঠিক করা যায়নি এখনো। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ে একটি সমীক্ষার মাধ্যমে পাহাড় কাটার নিরাপদ ধরন ঠিক করতে আমরা কাজ করছি।
আশা করছি ঝুঁকিপূর্ণ এসব পাহাড় রক্ষায় একটা সঠিক সমাধানে আসতে পারব আমরা সবাই। কাটা পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রিটেইনিং ওয়ালসহ যাবতীয় নিরাপত্তামূলক কাজের সমন্বয় সিডিএ করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পের শুরু থেকে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ইচ্ছামতো পাহাড় কর্তন করেছে সিডিএ। খাড়াভাবে পাহাড় কাটলে সেগুলো ভেঙে নিচেই পড়বে, এটা সবার জানা। সিডিএ এ পাহাড় একদিনে কাটেনি।
অনেক দিন ধরেই তারা পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণে কাজ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কেন সেগুলো নজরদারির মধ্যে আনেনি, সেটাই বোধগম্য নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর যদি নিয়মিত সিডিএর কাজ মনিটরিং করত তাহলে আজ পাহাড় কাটা নিয়ে এত সমস্যার মধ্যে পড়তে হতো না।
সূত্র: বিবি/এসএস/ফোরকান