সাতকানিয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ৭ কোটি টাকা লুট, অধরা ২ কর্মকর্তা!


৩ অক্টোবর, ২০২০ ১১:৩০ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া পৌরসভার দুই কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে সাড়ে সাত কোটি টাকার রহস্যজনক লেনদেন নিয়ে তোলপাড় চলছে। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিশ্বজিত দাশ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এএইচএম আলমগীরের নামে থাকা এনসিসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে এ বিপুল টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দু’জনের নামে যৌথ অ্যাকাউন্টও রয়েছে।

জানা যায়, দুই কর্মকর্তার যৌথ হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার মতো। এছাড়া হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এএইচএম আলমগীরের একক ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বেশি। প্রশ্ন উঠেছে- এত টাকার লেনদেন কীভাবে করলেন তারা। যদিও দুই কর্মকর্তাই বলছেন, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে অন্যের টাকা। ব্যবসায়ী বন্ধুরাই তাদের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই টাকা পাঠিয়েছেন। নিজেদের টাকা বলে কিছুই নেই তাদের। এর মধ্যে এক কর্মকর্তা অর্থকষ্টে রয়েছেন বলেও দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ দুই কর্মকর্তা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে টাকা নিজেদের ব্যাংক হিসাবে নিয়েছেন। সতাকানিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে আরসিসি সড়ক নির্মাণ, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ, পৌরসভার কাশিমবাড়ি পুকুর রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কাশিমবাড়ি বদ্দাপাড়া আরসিসি সড়ক নির্মাণ, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদফতরের অধীনে লোহাগড়া ব্রিকফিল্ড সড়ক নির্মাণসহ আরও একাধিক প্রকল্পের টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে নকশাকারক হিসেবে সাতকানিয়া পৌরসভায় যোগ দেন বিশ্বজিত দাশ। ২০১২ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সহকারী প্রকৌশলী হন। তাকে চকরিয়ায় পদায়ন করা হয়। চকরিয়া থেকে তাকে বদলি করা হয় বান্দরবানের লামা উপজেলায়। ২০১২ সালের শেষদিকে তিনি আবার সাতকানিয়া পৌরসভায় বদলি হয়ে আসেন। ৮ বছর ধরে তিনি এখানে কর্মরত। এছাড়া আলমগীর ২০০৬ সাল থেকেই সাতকানিয়া পৌরসভায় কর্মরত রয়েছেন।

২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের (এনসিসি) কেরানীহাট শাখায় প্রকৌশলী বিশ্বজিত দাশ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আলমগীর যৌথ হিসাব খুলেন। হিসাব নম্বর ০০৫৮-০৩২০০০১২৯০। এ সময় ব্যাংকে ১ হাজার টাকা জমা করেন।

হিসাব খোলার দুইদিন পর অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি জমা হয় ৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এরপর এই যৌথ হিসাবটিতে প্রতিমাসে জমা হয়েছে লাখ লাখ টাকা। বেশির ভাগ লেনদেনই ছিল ৫ লাখ থেকে ২২ লাখ টাকা পর্যন্ত। হিসাবটিতে ২০১৮ সালে জমা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। এরপর ২০১৯ সালে জমা হয়েছে (শুধু ১ লাখের বেশি লেনদেন হিসাব করে) ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর ফলে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে গত বছরের ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত মোট লেনদেন হয়েছে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার ৮১৭ টাকা।

যৌথ হিসাবের আগে ২০০৯ সালের ২৯ অক্টোবর একই ব্যাংকের কেরানীহাট শাখায় আরও একটি হিসাব খোলেন হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা এএইচএম আলমগীর। যার নম্বর ০০৫৮-০৩১০০০৯৫২৪। তার এ হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। তার হিসাবে ২০১৬ সালে জমা হয় (শুধু ১ লাখের বেশি লেনদেন হিসাব করে) ২১ লাখ টাকার বেশি।

২০১৭ সালে তার ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৭৪ লাখ টাকার বেশি। ২০১৮ সালে জমা হয় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এরপর ২০১৯ সালে জমা হয়েছে ৯৮ লাখ টাকার বেশি। ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৫৮ লাখ টাকার বেশি। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ব্যাংক হিসাবটিতে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯২ টাকা।

টিআইবির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, যে দেশে ড্রাইভার কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হন। সে দেশে একজন সহকারী প্রকৌশলী ও অ্যাকাউন্ট অফিসারের ব্যাংক হিসেবে ৭-৮ কোটি টাকা লেনদেন কোনো বিষয়ই না।

সহকারী প্রকৌশলী বিশ্বজিত দাশ এনসিসি ব্যাংকে হিসাব থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যাংক হিসাবটি এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লেনদেনের টাকাগুলো খাগড়াছড়ি এলাকার চেঙ্গি স্টোর নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আবু বক্কর দিয়েছে। তিনি আমার বন্ধু এবং ঠিকাদার। টাকাগুলো একসঙ্গে দেননি। ৫ লাখ ১০ লাখ করে দিয়েছেন। আমি ইট, বালি ও সিমেন্ট কিনে দিয়েছি। তাই আমার কাছে টাকা পাঠিয়েছে। তা ছাড়া আমার কাছে যে অর্থ-সম্পদ রয়েছে, তা ট্যাক্সফাইলভুক্ত। এখানে লুকোনোর কিছু নেই।

হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা এএইচএম আলমগীর এনসিসি ব্যাংকে হিসাব থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, লেনদেনের টাকাগুলো আমার ভাইয়ের। আমার ভাই বিভিন্ন জায়াগায় ইট, বালি সরবরাহ করে। এছাড়া আমার বাবা মারা যাওয়ার পর কিছু ল্যান্ড প্রোপার্টি আমরা বিক্রি করেছি। এছাড়া অন্যের টাকা আমার নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এখন এক টাকাও নেই। বরং দেনার ভারে জর্জরিত হয়ে পরিবার নিয়ে অর্থকষ্টে দিন পার করছি।

দুই কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল টাকা লেনদেন প্রসঙ্গে সাতকানিয়া পৌর মেয়র মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়েছে, লেনদেন হলেও এগুলো তাদের টাকা না অন্যের- এসব তাদের ব্যক্তিগত ও অফিসের বাইরের বিষয়। তাই এসব নিয়ে আমার কথা বলার সুযোগ নেই।

সূত্র: ডি জে/সকালের-সময়/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ