সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা অবিশ্বাস্য। সরকারি এই খাতে লুটপাটের চিত্র যেনো নতুন নয়। দেশের একমাত্র রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমী আরটিএ’তে এভাবে চলছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হরিলুট। এই একাডেমির দুর্নীতির শেষ কোথায় তা নিয়ে চলছে সমালোচনা।
জানা যায়, রেলের এই ট্রেনিং একাডেমিতে টাকা ছাড়া কোনো ফাইলেই নড়ে না। সনদ-বাণিজ্যেসহ নানা অনিয়মে গড়ে উঠেছে কাশেম/মেহেরুনের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গেস্ট লেকচার, টিএলআর, মেট্রোরেল, জাতীয় দিবসের মতো বিভিন্ন খাত দেখিয়ে ভুয়া বিলের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছেন সরকারের কাড়ি কাড়ি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, আরটিএর বর্তমান প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা আবুল কাশেম দীর্ঘদিন রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সিন্ডিকেট করে এই প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে রেখেছে। স্টেশন মাস্টার থেকে একলাফে আবুল কাশেম পদোন্নতির মাধ্যমে বনে যান প্রথম শ্রেণির রেল কর্মকর্তা। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতা প্রয়োজন হয় বলে আরএটিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারিক বিষয়ে সনদ-বাণিজ্য গড়ে তোলেন কাশেম। অনেক রেলকর্মী নির্দিষ্ট সময়ে সফলতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করেও সনদ পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু কাশেম/মেহেরুন সিন্ডিকেটকে টাকা দিয়েই প্রশিক্ষণ ছাড়াই সনদ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্ব রেলের একাধিক কর্মচারী জানান, প্রশিক্ষণের প্রতিটি কোর্সে আবুল কাশেম নির্দিষ্ট ফি ছাড়াও ক্লাসে উপস্থিতি, ব্যবহারিকসহ নানা খাত দেখিয়ে রেলওয়ের অর্থ লোপাট করে যাচ্ছেন দীর্ঘকাল ধরে।
জানা যায়, একাডেমীতে আবুল কাশেমের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন প্রধান অফিস সহকারী ও কাশেমের একান্ত মনের মানুষ মেহেরুন আকতার। তিনি রেলে নিয়োগ পান ২০০৪ সালে, অথচ যোগদান করেছেন ২০১১ সালে, এমনই এক অদ্ভূত কাণ্ড ঘটেছে পূর্ব রেলে। মেহেরুনকে রেলের বিধির তোয়াক্কা না করেই হালিশহর ট্রেনিং একাডেমিতে প্রধান সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, মেহেরুন আক্তার পূর্ব রেলে ২০০৪ সালে অফার লেটার পান। নিয়োগের ৭ বছর পর ২০১১ সালে যোগদানের কোন নিয়ম না থাকলেও আবুল কাশেমের মনের মানুষ হিসেবে তিনি এ পদে বহাল হয়েছেন।
সূত্র আরও জানায়, নিয়োগপত্র পাওয়ার পর রহস্যময় এই মেহেরুন আক্তারের ৭ বছর অনুপস্থিতির কারণ কেউ জানেন না। মেহেরুন আক্তারের নিয়োগ বিষয়ক কোন দাপ্তরিক তদন্তও এখনো হয়নি। যার কারণে সে এখনো রয়েছে বহাল তবিয়তে। গত ২৯ জানুয়ারি অনুসন্ধানে অডিট টিম এসেও মেহেরুন আক্তারের ফাইলটি খুজে পায়নি। এ নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে রেল ভবনে।
জানা যায়, উচ্চমান সহকারী/প্রধান অফিস সহকারী হতে হলে কমপক্ষে ৩/৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, অবাক করার বিষয় এক মাসের মধ্যেই মেহেরুন আক্তারকে প্রধান অফিস সহকারী পদে দায়িত্ব অর্পণ করে দপ্তর আদেশ স্বাক্ষর করিয়ে নেন ট্রেনিং কর্মকর্তা আবুল কাসেম। এর আগে কক্সবাজারে রেক্টর আনোয়ার হোসেন, আবুল কাসেম ও মেহেরুনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে সমালোচনা চলে খোদ রেলের সর্বমহলে।
এ বিষয়ে রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়োগবিধি ইএন্ডডি রুলর্স ১৯৬১-এর বিধির ধারা উপধারা মতে মেহেরুন আক্তারকে নিয়োগের বৈধতা পাওয়া যায় না। তাহলে সে কিভাবে এতদিন রেলে চাকুরী করে আসছে এমন প্রশ্ন খোদ রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
জানা যায়, ট্রেনিং কর্মকর্তা আবুল কাসেমের বিশেষ মনের মানুষ এই মেহেরুন। তার মনের আশীর্বাদেই পরিক্ষায় প্রথম স্থানে দেখানো হয় মেহেরুনকে। এছাড়াও ভাইভা শিটে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী নম্বর পেতে এইচএসসি পাস মেহেরুন আক্তারকে দেখানো হয় এমএসসি পাস।
আরও জানা যায়, ট্রেনিং একাডেমির অনিয়ম/দুর্নীতির ব্যাপারে মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন রেলের এক ভূক্তভোগী অফিস স্টাফ। তখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে তদন্তের নির্দেশ এলেও সেটি না করে বরং ঐ অফিস স্টাফকে অশোভন আচরণের অভিযোগ এনে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলেও জানা যায়।
এ বিষয়ে জানার জন্য মেহেরুন আক্তারের
মোঠোফোনে কল দেয়া হলে তিনি সকালের-সময়কে তার এই অনিয়মের বিষয়ে কোন সদুুত্তর দিতে পারেনি।
আরও জানা যায়, মেহেরুনের এসব অমিয়মের পিছনের আরেক শক্তি নেতা লোকমান, তিনি মেহেরুনকে জাল-জালিয়াতি করে রেলে চাকুরী দিয়েছেন। এবং এই মেহেরুনের কোন সমস্যা হলে তদবির করেন এই লোকামান।
আর এদিকে, এমএলএসএস (টিএলআর) রোকেয়া বেগম রুবি, টিপু সুলতান, আলাউদ্দিন, আনিসুর রহমান, আলাউদ্দিন ও সুজিত চন্দ্র নাথ। তারা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরটিএর (সম্প্রতি অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়া) রেক্টর আনোয়ার হোসেন, সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জোবেদা আক্তারসহ কয়েকজনকে ম্যানেজ করে নানা অনিয়ম করে আসছেন।
আরও জানা যায়, ট্রেনিং একাডেমীতে শিক্ষার্থীরা ফেল করলেও টকার বিনিময়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা পাস করিয়ে দেন। বিভিন্ন দিবসে রেলওয়ে আরটিএর জন্য বরাদ্দ দেয়। কিন্তু কোনো কর্মসূচি না করেই সেই অর্থ ভুয়া ভাউচারে তুলে নেয় কাশেম সিন্ডিকেট। নিয়ম অনুযায়ী রাজধানীর চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের নিয়োগ পাওয়াদের আরটিএতে প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
এ জন্য কোর্সবাবদ রেলের এই প্রতিষ্ঠানটিকে বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। কিন্তু সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশিক্ষণ না দিয়ে যানবাহন, পণ্য কেনা ছাড়াও বিভিন্ন ভুয়া বিল দেখিয়ে এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আরটিএর সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, আবুল কাশেম দপ্তরে বসে ফাইল সই করেন। তার পাশের চেয়ারে বসে ফাইল গুনে উৎকোচ নেন মেহেরুন আকতার। নির্দেশমতো সব আগে থেকেই তিনি ঠিক করে রাখেন এই মেহেরুন।
জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ-বাণিজ্য করে এমএলএসএস পদে মোটা অঙ্ক ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে টিএলআর পদে নিয়োগ পান রোকেয়া বেগম রুবি, টিপু সুলতান, মো. আলাউদ্দিন, মো. আনিসুর রহমান ও মো. আলাউদ্দিন। তাদের মধ্যে টিপুর বাবা মো. ওমর আলী আরটিএর উচ্চমান সহকারী ছিলেন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর তিনি অবসরে গেলেও আবুল কাশেম তাকে দিয়ে নিয়মিত অফিস করছেন।
তিনি আবুল কাশেম বিশ্বস্ত লোক হওয়ায় বিভিন্ন জনের সঙ্গে দেনদরবারও করান কাশেম । তার ছেলে অফিস না করলেও হাজিরা খাতায় নাম রয়েছে। রোকেয়া বেগমের স্বামী মো. বেলাল হোসেন মেট্রোরেলের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে বাবার পরিচয়ে চাকরি নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আবুল কাশেমকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রোকেয়া চাকরি পেয়েছেন। তার মতো বর্তমানে কর্মরত ৫টি এলআরের প্রত্যেকের থেকে টাকা নিয়েছেন আবুল কাশেম। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। কিন্তু এই পাঁচজনকে উপস্থিত দেখিয়ে প্রতি মাসে বিল করা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
আরও জানা যায়, অতিথি বক্তাদের সম্মানী বাবদ মাসে ২ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একাডেমিতে নিয়মিত ক্লাস হয় না। অনুমোদন ছাড়াই ক্লাস রুটিন পরিবর্তন হয় এখানে। অতিথি বক্তা না এনেও ভুয়া ব্যক্তিদের নাম দেখিয়ে অর্থ নয়ছয় করেন আবুল কাশেম সিন্ডিকেট। এমনকি টিআরও (ট্রেনিং অফিসার ট্রাফিক) থাকাকালে নিজে অবৈধভাবে টিআরও মেকানিক্যাল হিসেবে লেকচার ফি নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য মোঠোফোনে আবুল কাশেমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের-সময়কে বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা, আমি এসবে নেই। এখানে যাকিছু হয় নিয়ম মেনে হয়। নতুন নতুন কোনো খাত তৈরি করে বিল হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। এবং এখানে প্রত্যেকে বৈধভাবে চাকরি পেয়েছেন। নিয়োগের ক্ষেত্রেও সব নিয়ম মানা হয়েছে, দুর্নীতি তেমন করিনি।
এ বিষয়ে রেলের মহাপরিচালক (ডিজি) বলেন, কাশেম সিন্ডিকেটের লুটপাট মেনে নেওয়া হবে না। তাদের এই অনিয়মের ব্যাপারে খোজ খবর নেয়া হবে। অভিযোগ সত্য প্রমানিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সূত্র: ডিআর/সিপি/এসএস/ফোরকান