চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা আলীনগরে অভিযান শুরু হয়েছে। সেখানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা মোহাম্মদ ইয়াছিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবার তাঁর ‘রাজ্যে’ আঘাত হেনেছে প্রশাসন। শুক্রবার প্রথম দিনে ঘটনাস্থল থেকে পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত দুটি স্কেভেটর ও তিনটি ড্রাম ট্রাক জব্দ করা হয়। এর আগে এক ইউপি সদস্যকে মারধরের ঘটনায় ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় ইয়াসিন ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছে আলীনগর নামে স্বঘোষিত গ্রাম। সেখানে সরকারি জমিতে প্লট তৈরি করে তা বিক্রির মাধ্যমে তাঁরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সেখানে ইয়াছিন বড় রাজা হিসেবে পরিচিত। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে ছোট রাজাখ্যাত মোহাম্মদ ফারুক।
শুক্রবার সেখানে চলা অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল আলম ও আবদুল্লাহ আল মামুন। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল করিম, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ ও র্যাব ৭-এর সহকারী পরিচালক জিন্নাতুল ইসলাম।
আশরাফুল আলম বলেন, স্থানীয় মেম্বারকে মারধরের অভিযোগে গত সোমবার ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাঁর কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর ভিত্তিতেই অভিযান চলছে। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে সলিমপুর এসে ঘাঁটি গাড়েন ইয়াসিন। এরপর ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজ সাম্রাজ্য ও সন্ত্রাসী বাহিনী।
জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত ইয়াছিন নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানা কেশার পাড় গ্রামের শামশুল হকের ছেলে। তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস করছেন। এই এলাকার আলীনগরের অঘোষিত রাজা ও পাহাড় খেকো হিসেবে তিনি পরিচিত বলে জানান স্থানীয়রা।
সন্ত্রাসী ইয়াছিন গত কয়েক বছর আগে জীবিকার সন্ধানে ছোট ভাই ফারুককে নিয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। তিনি প্রথমদিকে বেশ কয়েক মাস অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর কিছুদিন পর নোয়াখালী থেকে বেশ কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের এনে জঙ্গল সীলমপুরে আশ্রয় দেন এবং তাঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন পাহাড় দখল, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও গুমসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
ইয়াছিন সন্ত্রাসী বাহিনীর সহায়তায় জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ের একটি অংশ কেটে সেখানে প্লট বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর দখল করা পাহাড়ের নাম দেন আলীনগর। আর সেখানে করা প্লট বিক্রির মাধ্যমে কোটিপতি বনে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়াছিন হয়ে ওঠেন আলীনগরের স্বঘোষিত রাজা। আলীনগরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সেখানে বহিরাগতের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। এ ছাড়াও সেখানে বসবাস করা লোকজনকে বাইরে যেতে নিতে হতো ইয়াছিন ও তাঁর ভাই ফারুকের অনুমতি।
স্থানীয়রা জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও ইউপি সদস্যকে মারধরের মামলায় অভিযুক্ত আসামি ফারুক, সজীব, নুরুল ইসলাম, শাহজাহান ও আল আমিন সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারিক হাকিম বেগম নাজমুন নাহারের আদালতে স্বেচ্ছায় জামিন নিতে যান। পরে আদালত তাঁদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠান।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন জানান, জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ের বেশ কিছু পাহাড় দখল করে নিজের অপরাধের স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছিল সন্ত্রাসী ইয়াছিন। আর তাঁর রাজ্যে বহিরাগতের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে গড়ে তুলেছেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। ইয়াসিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র, গুম ও নাশকতাসহ সীতাকুণ্ড থানায় ৮ টিরও অধিক মামলা রয়েছে।
সকালের-সময়/ফোরকান