রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মাদক আমদানির নিরাপদ রুট চট্টগ্রাম বন্দর!


২৬ জুলাই, ২০২২ ১:০৭ : পূর্বাহ্ণ

দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রাণ ও সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় উৎস চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মিথ্যা ঘোষণায় সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মদ, সিগারেট, কোকেনের পাশাপাশি নানা অবৈধ রাসায়নিক দ্রব্য আমদানির নিরাপদ আস্তানা হয়ে উঠেছে এ বন্দর। এ ধরনের আমদানি কর্মকাণ্ড বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কতিপয় অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তা ও সিএনএফ এজেন্ট জড়িত বলে জানা গেছে।

সোমবার বিকালেও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুই কন্টেইনার বিদেশি মদ জব্দ করেছে কাস্টমস। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সুতা ও কাঁচামাল ঘোষণায় এ মদ আমদানি করে নীলফামারী উত্তরা ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান ডং জিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড এবং মোংলা রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) ভিআইপি ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড।

এর আগে রোববার মিথ্যা ঘোষণায় চট্টগ্রাম বন্দরে একই প্রতিষ্ঠানের আনা এক কন্টেইনার মদের চালান জব্দ করে কাস্টমস। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় চালানটিতে ১ হাজার ৪৩০টি কার্টনে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৫ হাজার ২০৪ লিটার বিদেশি মদ পাওয়া যায়। এগুলোর আনুমানিক শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এতে প্রায় ১২ কোটি ৪৫ লাখ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে।

আর শনিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অবৈধভাবে খালাস হওয়া দুই কন্টেইনার মদ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অভিযান চালিয়ে জব্দ করে কাস্টমস কর্মকর্তারা। কুমিল্লা ইপিজেডের হাসি টাইগার কোম্পানি লিমিটেড মেশিনারি এবং পাবনার ঈশ্বরদীর বিকেএইচ টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে সেলাই মেশিনের ববিন ঘোষণা দিয়ে চালান দুটি আমদানি করা হয়েছিল।

শতভাগ পরীক্ষায় পণ্য চালান দুটিতে ১ হাজার ৩৩০ কার্টনে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৩১ হাজার ৬২৫ দশমিক ৫ লিটার বিদেশি মদ পাওয়া যায়। এর শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পণ্য চালান দুটিতে মিথ্যা ঘোষণায় ২৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে গত তিন দিনে পাঁচ কন্টেইনার মদের চালান আটক করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ২৬ মে চীন থেকে অবৈধভাবে আনা আমদানি নিষিদ্ধ ১৯ মেট্রিক টন সোডিয়াম সাইক্লামেট (ঘনচিনি) জব্দ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ক্যানসারের অন্যতম উপাদান হিসেবে শনাক্ত হওয়া এসব ঘনচিনি চট্টগ্রাম বন্দরে আনে ঢাকার বংশালের ডিএসএস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এর আগে ৮ মে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে কোটেড ক্যালসিয়াম কার্বনেট আমদানির ঘোষণা দিয়ে ডেক্সট্রোজ মনোহাইড্রেট আনা হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৪২ লাখ ১৩ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করেছিল ঢাকার বংশালের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এনবি ট্রেডিং হাউস।

এ ঘটনায় কাস্টমস কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাস্টম অ্যাক্ট ১৯৬৯-এর সেকশন-৩২ ভঙ্গের দায়ে আমদানিকারকের ওপর ৮৮ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।

এর আগে ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে খেজুর আমদানির ঘোষণা দিয়ে বিদেশি সিগারেট আনা হয়। এ সময় একটি কন্টেইনারে ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ৪০০ শলাকা বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। সিগারেটের আনুমানিক মূল্য ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ চালানে ৭ কোটি ১১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করেছিল চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সূচনা ইন্টারন্যাশনাল।

গত ৭ এপ্রিল পাটপণ্য চালানের মাধ্যমে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭২ টাকা অবৈধ নগদ প্রণোদনা প্রাপ্তির অপচেষ্টা রুখে দেয় চট্টগ্রাম কাস্টমস। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ৩ কোটি ৮১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫৯ টাকা অবৈধ উপায়ে দেশে আনার অপচেষ্টাও রুখে দেয়।

এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার শলাকা বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। এ চালানে ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করেছিল পাবনার ঈশ্বরদী থানার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তিয়ানে আউটডোর বিডি কোম্পানি লিমিটেড। এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি রোববার ইতালি থেকে বৈদেশিক ডাকে আসা একটি চালান থেকে দুটি এইটএমএম পিস্তল ও ৬০টি কার্তুজ উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। পার্সেল আসা কার্টনে গৃহস্থালি পণ্য, ক্রোকারিজ মালামাল থাকার ঘোষণা ছিল। পার্সেল খুলে ফ্রাইপেন, ব্লেন্ডার ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত ছুরির সঙ্গে চারটি পিস্তল পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি আসল ও দুটি খেলনা পিস্তল ছিল।

এর আগে ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গার্মেন্টস পণ্যের চারটি চালান উদঘাটন করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। কেডিএস লজিস্টিকস লিমিটেড নামে বেসরকারি ডিপোতে কন্টেইনারে এসব পণ্য লোড করা হয় ফিলিপাইনে রফতানির জন্য। এর মাধ্যমে ৬ কোটি ৬২ লাখ ৬৭ হাজার ৭৮৮ টাকা পাচারের অপচেষ্টা চলে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর মাসেও মিথ্যা ঘোষণায় আনা চারটি চালান ধরা পড়ে।

এসব চালানে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে ২৩ ডিসেম্বর আপেল ঘোষণায় আরব আমিরাত থেকে আনা ২২ লাখ ১৯ হাজার শলাকা বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট ধরা পড়ে। এ চালানে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করা হয়। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার স্টেশন রোডের মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুট এই চালানের আমদানিকারক।

একইভাবে ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর চীন থেকে এ ফোর সাইজ প্রিন্টিং পেপারের ভেতরে লুকিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা ১ কোটি ৬২ লাখ পিস সিগারেটের জাল স্ট্যাম্প ধরা পড়ে। এতে ১২০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের আরফাত এন্টারপ্রাইজ। আর ১৪ ডিসেম্বর চীন থেকে আর্ট পেপারের ভেতরে লুকিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা ৩ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার পিস নিম্নস্তরের ১০ শলাকাবিশিষ্ট সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার উপযোগী হালকা খয়েরি রঙের জাল স্ট্যাম্প জব্দ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস।

১১ ডিসেম্বর ২৫ টন পলেস্টার সুতার মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা ৯.৮৬ টন কেমিক্যাল জাতীয় পণ্য জব্দ করে কাস্টমস। ময়মনসিংহ ভালুকার প্রতিষ্ঠান পিএনআর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এসব পণ্য আমদানি করে। চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল আগ্রাবাদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রাসেল গার্মেন্টস।

এভাবে ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি কন্টেইনার ভর্তি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট জব্দ করে কাস্টমস। বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড কেমিক্যাল ফাইবার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে কাপড় ও কাপড়ের সরঞ্জাম আনার মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ শলাকা সিগারেট আমদানি করে। যেখানে শুল্ক-করসহ ২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ভয়ঙ্কর মাদক কোকেনের একটি বড় চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে।

এভাবে ২০২১ সালে ১ হাজার ৭৩৯টি ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যের চালান শনাক্ত করে কাস্টমস। এর মধ্যে ৭৪১টি চালানে ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে আমদানিকারকরা। তবে এসব চালানে ৫৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকাসহ মোট ১০৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে কাস্টমস।

শুধু ২০২১ সাল নয়, ২০২০ সালেও ১ হাজার ৩১৩টি, ২০১৯ সালে ৪২৯টি, ২০১৮ সালে ৫২৭টি মিথ্যা ঘোষণায় পণ্যের চালান ধরা পড়ে, যেখানে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয় বলে কাস্টমস সূত্র জানায়।

বন্দর ব্যবহারকারী আনিসুর রহমান, সোলায়মান আলীসহ কয়েকজনের তথ্যমতে, প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিষিদ্ধ ও শুল্কযোগ্য পণ্য আমদানি করছে কতিপয় অসাধু আমদানিকারক। কাস্টমসে ঘুষ বাণিজ্যের ফলে সরকারের প্রাপ্য হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় অসাধু আমদানিকারকরা এ পথ বেছে নিয়েছে। কাস্টমসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার মো. সাইফুল হক বলেন, কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনিয়মের দায়ে আমদানিকারকসহ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জরিমানা বাড়ানোর পর মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি কমেছে। এরপরও যারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এসএ/এসএস/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ