পাহাড়খেকো কাউন্সিলর দম্পতির লাগাম টানবে কে!


৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ৫:৩৪ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আকবর শাহ এলাকার পাহাড়গুলো বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমের লোভের শিকার। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি সাবাড় করেছেন ৪২টির মতো পাহাড়। সম্প্রতি উত্তর পাহাড়তলী লেকসিটি এলাকার তিনটি পাহাড় প্রায় সাবাড় করে ফেলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে পাহাড় কাটা মাটি ফেলে ভরাট করেছেন পাশের কালিরছড়া খাল। গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত অফিস ও গরুর খামার। বিক্রির জন্য করেছেন অর্ধশতাধিক প্লট। অথচ এ পাহাড়ের পাদদেশে মাত্র ১২ শতক জমির মালিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম ও তার স্ত্রী তাছলিমা বেগম।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ৩টি পাহাড় সাবাড় করেছেন তিনি। এর আগে পাশের বেলতলী ঘোনার ৩ একরের আরেকটি পাহাড়ও তিনি সাবাড় করেছেন। বাবার নামে গড়ে তুলেছেন একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর এ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও জরিমানা করা হলেও তা কেয়ার করছে না পাহাড়খেকো হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কাউন্সিলর জসিম। এমনকি গণমাধ্যম কর্মীসহ যে কেউ এই পাহাড় কাটা পরিদর্শনে গেলে তাদের ওপর চালানো হয় হামলা।

সম্প্রতি সরেজমিন লেকসিটি পাহাড়ি এলাকায় গেলে এসব অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিছুদিন আগে পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার পথে সাংবাদিকদেরও রাস্তায় বাধা দেন পাহাড় কাটায় জড়িত কয়েকজন দুষ্কৃতকারী যুবক। তারা পরিচয় পাওয়ার পর ওই এলাকায় যাওয়া যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন। কেন যাওয়া যাবে না সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তাদের একজন সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, এখানে ম্যাজিস্ট্রেট এলেও ঢুকতে পারে না। গত বৃহস্পতিবারে এখানে কী হয়েছে আপনি বোধ হয় তার কিছুই শোনেননি, শুনলে এখানে আসার সাহস দেখাতেন না।

স্থানীয় লোকজন জানান, পাহাড় কাটা দেখতে এসে গত কয়েক মাস আগে পরিবেশ অধিদফতরের একজন ম্যাজিস্ট্রেট এই দুষ্কৃতকারীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। আর গত বৃহস্পতিবার বিকালে বেসরকারি সংস্থা ‘বেলা’র কয়েকজন কর্মকর্তা হামলার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় আকবর শাহ থানায় বেলার করা মামলায় আবু নোমান (৪০) নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সে ওই মামলার তিন নম্বর আসামি। আকবর শাহ থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর শনিবার রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার পাহাড় কাটায় গত ২৮ ডিসেম্বর কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদফতরে অভিযোগ দেন তিনি। এরপর ১৬ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন তারা।

অভিযোগে তিনি বলেন, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ১২৮ দাগের পাহাড়ি ভূমির মধ্যে এক একরের মতো ব্যক্তি মালিকানাধীন, বাকি পাহাড় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার। ৮ দশমিক ৬ একরের ৩টি পাহাড়ের ৮০ ভাগই এখন কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অর্ধশতাধিক প্লট। গড়ে তোলা হয়েছে কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত অফিস ও গরুর খামার। চারপাশে দেওয়া হয়েছে সীমানা দেয়াল।

এর আগে পাশের বেলতলী ঘোনার ৩ একরের একটি পাহাড়ও সাবাড় করেছেন তিনি। সেই পাহাড় কেটে জহুরুল আলম জসিম তার বাবা আবিউল হকের নামে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করেছেন। এর আধা কিলোমিটার দূরে ১৭৭ দাগের সরকারি একটি পাহাড় কেটেও নিশ্চিহ্ন করেছেন তিনি। এ ৩ এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগে জহুরুল আলম জসিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ৩টি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদফতর।

সর্বশেষ মামলাটি হয় গত বছরের আগস্টে। কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। এভাবে আকবর শাহ এলাকায় প্রতিদিন পাহাড় কেটে নতুন নতুন প্লট তৈরির কাজ চলছে। বাইরের কেউ ওই এলাকায় ঢুকলেই বাধার মুখে পড়েন। সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকেন এক দল দুষ্কৃতকারী যুবক।

পাহাড় কাটা ও কালিরছড়া খাল ভরাটের স্থান পরিদর্শনে গিয়ে গত কয়েকদিন আগে বিকালে কাউন্সিলর ও তার লোকজনের বাধার মুখে পড়েন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ তার একটি দল। এ সময় রিজওয়ানা হাসানের গাড়িতে ঢিল ছুড়ে মারমুখী আচরণ করা হয়। এ ঘটনায় আকবর শাহ থানায় কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমকে প্রধান আসামি করে মামলা হয়েছে।

বেলার চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়কারী আলিউর রহমান বলেন, লেকসিটি এলাকায় অব্যাহত পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। এতে পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে বিবাদী করা হয়। রিটে আকবর শাহ থানা এলাকার উত্তর পাহাড়তলী মৌজার সাড়ে ১০ একর পাহাড় কাটা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। পরে ২০২০ সালে ওই এলাকার পাহাড় রক্ষার বিষয়ে রুল জারি করেছিলেন আদালত।

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, শুধু আকবর শাহ এলাকা নয়, চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা বন্ধের বিষয়ে আগেই হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল। কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। অভিযোগ পেয়ে আমরা আকবর শাহ এলাকায় পাহাড় কাটা পর্যবেক্ষণে যাই। কিন্তু মূল জায়গায় যাওয়ার আগেই আমরা বাধার সম্মুখীন হই। এসবের মূলহোতা কাউন্সিলরই। কাউন্সিলর দুর্বৃত্তদের বাহিনী গড়ে তুলে সেখানে পাহাড় ও ছড়া খাল ধ্বংস করে ফেলেছেন। এ ঘটনায় আমরা থানায় মামলা করেছি, বিষয়টি আবার আদালতের নজরেও এনেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আমি চাই ওই এলাকার পাহাড় যেন আর কাটা না পড়ে। প্লটগুলো যেন বিক্রি করতে না পারে। আর আমাদের কাছে যারা অভিযোগ করেছেন তারা যেন কোনো রকম সমস্যার সম্মুখীন না হন। সব মিলিয়ে পুলিশ প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা দেখব। এরপর আমার ব্যবস্থা নিব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর আকবর শাহ থানার এক পুলিশ অফিসার বলেন, বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনাটির তদন্ত চলছে। দোষীদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০৭ সাল থেকে পাহাড় কাটা শুরু করেন জহুরুল আলম জসিম। তখন তিনি উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। বর্তমানে তিনি ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। দলীয় ও কাউন্সিল পদের প্রভাব খাটিয়ে এলাকাভিত্তিক বাহিনী গঠন করে পাহাড় কাটেন তিনি। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি আকবর শাহ এলাকার অন্তত ৪২টি পাহাড় কেটে সাবাড় করেছেন। পাহাড় কেটে তৈরি করা প্রতিটি ৩ ও ৫ কাঠার প্লট ৩ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। এ পর্যন্ত ১০০টির মতো প্লট বিক্রি করেছেন তিনি।

স্থানীয়দের মতে, নগরীর এ কে খান এলাকা থেকে বিশ্বব্যাংক কলোনি হয়ে আকবর শাহ থানাধীন লেকসিটি আবাসিক এলাকায় যেতে হয়। এর পাশেই উত্তর পাহাড়তলী মৌজার পাহাড়। লেকসিটি আবাসিকে যাওয়ার জন্য পাহাড় কেটে গড়া সড়কটি অপর প্রান্তে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ সংযোগ সড়কের সঙ্গে মিশেছে। যোগাযোগ সুবিধা বাড়ায় এ এলাকার জায়গার চাহিদাও বেড়েছে। ফলে পাহাড় কেটে প্লট বিক্রির তৎপরতাও বাড়িয়েছেন কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম। পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি করে শতকোটি টাকার মালিক কাউন্সিলর জসিম।

জুনায়েদ আহমদ নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে নগরের আকবর শাহ থানা এলাকায় বিপুল আয়তনের খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় কেটে প্লট আকারে বিক্রি করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন কাউন্সিলর জসিম। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, মারামারি, দখলবাজি, পাহাড় কাটার অভিযোগে বহু মামলা আছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম নগরীর খুলশি থানার আরও এক পুলিশ অফিসার। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে জসিমের বিরুদ্ধে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ আসতে থাকে পুলিশের কাছে। তার বিরুদ্ধে পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেটের দেড়শতাধিক দোকান দখল এবং বিশ্বব্যাংক কলোনি এলাকায় কবরস্থানের জায়গা দখলেরও অভিযোগ আছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংক কলোনিতে জসিমের আছে ১৫ কোটি টাকার ১৭টি প্লট, ফিরোজ শাহ কলোনিতে আছে ৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৬টি প্লট এবং দুটি ৬ তলা ভবন। লেকসিটি হাউজিংয়ে আছে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৬টি প্লট এবং ১৮ কোটি টাকা মূল্যের ৮০০ শতক খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়। লেকসিটি প্রকল্প এলাকায় আছে তার বিশাল ডেইরি ফার্ম।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম ২০০৭ সালে ইস্পাহানি মিলস লিমিটেড নামের একটি কারখানায় সুপারভাইজার পদে মাত্র আড়াই হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতো তিনি এখন শত কোটি টাকার মালিক।

এ বিষয়ে জানতে কাউন্সিল জহুরুল আলম জসিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে সকালের-সয়মকে বলেন, আপনি এসে দেখে যান আমি কি করেছি, আমি বেলার লোকজনের উপর হামলা করিনি, তখন আমি অফিসে ছিলাম, আপনি আমার অফিসে আসেন, আমার সাথে সরাসরি কথা বলেন, এবং আমার কাছ থেকে কারা কারা টাকা-পয়সা লেনদেন করছে আমার কাছে সিসিটিভি ফুটেজ আছে, কারা জায়গা দখল করেছে আমার কাছে কাগজ আছে।আপনি সামনা-সামনি আসেন, আপনারা সাংবাদিক আপনাদের কাছ থেকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ আশা করি। 

বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগরের এক উপ-পরিচালক বলেন, আগের পাহাড় কাটার ঘটনায় কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলা এখন নিয়মিত আছে। নতুন করে পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়ার পর সিডিএ, সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবেন।

সকালের-সময় ডটকম

0Shares

আরো সংবাদ