তদন্ত শেষ না হতেই মূল অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দুদকের!


৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ৩:৫৪ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিল জালিয়াতির ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। এ সংক্রান্ত মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ডা. ফজলে রাব্বিসহ পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতা পান। তখন এই কর্মকর্তা মামলার সুপারিশ করেন। পরে দায়ের করা মামলায় কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ ছাড়াই তদন্তাধীন অবস্থায় বিল জালিয়াতির মূলহোতা শুধু ডা. ফজলে রাব্বিকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে গত এপ্রিলে পদোন্নতি পেয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক হন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের সংগঠিত করার অভিযোগও রয়েছে এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ওই কর্মকর্তাকে দুদক দায়মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বর্তমানে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রয়েছেন।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের শুরুতে দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে ১০০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘোষণা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। এসময় সারাদেশে আইসিইউ সংকটের মধ্যে হাসপাতালের গোডাউনে পড়ে থাকা ১৫ কোটি টাকার নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (আইসিইউ) শয্যা, আইসিইউ ভেন্টিলেটর ও কার্ডিয়াক পেশেন্ট মনিটরসহ যন্ত্রপাতিগুলো জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। পাশাপাশি ওই সময়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী (বিগত সরকারের শিক্ষামন্ত্রী) এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে সভাপতি করে গঠিত একটি কমিটি ২০২০ সালের ১৯ মে আলোচনার মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দেন। যথারীতি এসব যন্ত্রপাতি জেনারেল হাসপাতালে সংযোজন করা হয়।

এ সুযোগে এসব যন্ত্রপাতির বকেয়া থাকা ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিল দাবি করেন ঠিকাদার। ঠিকাদারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিলের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে ‘ব্যয় মঞ্জুরি’ প্রদান করা হয়নি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দেন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের দায়িত্বে ছিলেন।

এরপর ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিল পরিশোধের জন্য ব্যয় মঞ্জুরিপত্র চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। তারপরও মন্ত্রণালয় ব্যয় মঞ্জু্রপিত্র না দিলেও ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে উদ্যোগী হন ডা. রাব্বি। ২০২২ সালের ২৮ জুন বিলটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে উপস্থাপন করা হয়। বিলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয় একটি ভুয়া ব্যয় মঞ্জুরিপত্র। ওই বিলটিতে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে একক স্বাক্ষর করেন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি।

তখন চট্টগ্রাম বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে উপস্থাপন করা বিলে যুক্ত ব্যয় মঞ্জুরিপত্রটি ভুয়া দাবি করেন হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তারা। বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। তবে সরকারি বিলে ডকুমেন্ট জালিয়াতির বিষয়টি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় ২০২২ সালের ৩০ জুন দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ লিখিত অভিযোগ দেন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক।

ঘটনায় জড়িত ডা. সেখ ফজলে রাব্বিও
ব্যয়মঞ্জুরি জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করেন দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক। অভিযোগ তদন্তে ব্যয়মঞ্জুরিপত্র জালিয়াতির ঘটনায় হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বির জড়িত থাকার প্রমাণ পান দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর ফজলে রাব্বিসহ আরও চারজনকে আসামি করে মামলার সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা এনামুল।

অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক এনামুল প্রতিবেদনে মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মুন্সি ফররুখ হোসাইন ওরফে মুন্সি ফারুক, তার ভাই মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন, তাদের অফিস স্টাফ মুকিত মণ্ডল, জেনারেল হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ফোরকান এবং হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বির বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে নিজেরা লাভবান হয়ে অন্যকে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে ভুয়া ব্যয় মঞ্জুরিপত্র তৈরি করেন, এই পত্রে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করেন দুদকের এই কর্মকর্তা।

পরে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯, ৫১১ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এনামুল হকের প্রতিবেদনটি গত বছরের ২৯ আগস্ট দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠান ওই কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাৎ।

এ বিষয়ে ডা. সেখ ফজলে রাব্বির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডা: সেখ ফজলে রাব্বির অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়ার
বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কোনো বক্তব্য দেননি দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন। তবে দুদকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ডা. সেখ ফজলে রাব্বির অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে মাঠ পর্যায় থেকে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ