চসিকে লঙ্কাকাণ্ড–রাতারাতি প্রকৌশলীর বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার


২ অক্টোবর, ২০২৪ ৭:২২ : অপরাহ্ণ

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ে সড়কবাতি বন্ধের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ ‘মুক্ত’ হলেন তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই। ‘রাতারাতি’ বরখাস্তাদেশ ‘প্রত্যাহার‘ করে তাঁকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে অবমুক্ত করা হয়েছে। রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম তাঁকে অবমুক্ত করে অফিস আদেশ জারি করেন।

এর আগে, ২৬ সেপ্টেম্বর ‘সাময়িক বরখাস্ত’ মাথায় নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনে বদলি হন চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা এ নির্বাহী প্রকৌশলী। যদিও বদলির আদেশে কোথাও সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে বদলির দুদিন পর ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁর বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার করে আরেকটি অফিস আদেশ জারি করেন প্রধান নির্বাহী শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনা ও নানা অনিয়ম তদন্ত করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। গত ১৪ আগস্ট চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার লতিফুল হক কাজমীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি তদন্তকাজ পরিচালনা করছে। ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ‘সময়ক্ষেপণে’ তা গড়িয়েছে ‘শিগগির’ এ। মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার লতিফুল হক কাজমী বলেন, ঝুলন বাবুর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা দেওয়া হয়নি। তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। কিছু সমস্যার কারণে প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হচ্ছে। আমরা শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিব।

তদবিরে বদলি 

চট্টগ্রামের একজন ‘সমন্বয়ক’কে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন উপদেষ্টা হাসান আরিফের দ্বারস্থ হন চসিক প্রকৌশলী ঝুলন দাশ। আন্দোলনের সময় বাতি নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনা চাপিয়ে দেন করপোরেশনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তাসহ আরো কয়েকজন প্রকৌশলীর কাঁধে।

এরপরই মন্ত্রণালয় থেকে ওই দুই কর্মকর্তার একজন, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ঝুলন দাশ এবং আরেক সহকারী প্রকৌশলীর বদলির আদেশ আসে— চসিক ভবনে এমন ‘খবর’ মুখে মুখে। তবে এসব খবরের কোনো সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ওই ‘সমন্বয়ক’কে একাধিকবার ফোন-মেসেজ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ফোন ধরলেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ঝুলন দাশ।

জলঘোলা বদলি আদেশ

বাতি নেভানোকাণ্ডে সাময়িক বরখাস্ত হলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা ওই বদলি আদেশে ‘রহস্যজনকভাবে’ উহ্য রাখা হয় সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি। শুধু তাই নয়, পদ-পদবি নিয়ে হয়েছে ‘জলঘোলা’। ২৬ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বদলি আদেশে, তাঁর (ঝুলন কুমার দাশের) মূল পদবি নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করে রংপুর সিটি করপোরেশনের ওই দায়িত্বেই বদলি করা হয়। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর সংশোধন করে আরো একটি বদলি আদেশ পাঠানো হয়।

বদলি আদেশের ‘ভুলে’ আটকা প্রধান প্রকৌশলী!

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ‘আন্দোলনে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগ’ থাকলেও ‘অনায়াসে’ অবমুক্ত হয়েছেন ঝুলন দাশ। তবে একই আদেশে, বদলি হওয়া প্রধান প্রকৌশলীর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহিন-উল ইসলাম চৌধুরী ‘আটকে’ গেছেন প্রজ্ঞাপনে ভুলের অজুহাতে।

মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) পর্যন্ত তাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে অবমুক্ত করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন। কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বদলি আদেশে কিছু ভুল ছিল। তাই ওটা সংশোধন হয়ে আসার পর বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের চসিক থেকে অবমুক্ত করা হবে।’ যদিও বদলির আদেশ অনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করলে ৩০ সেপ্টেম্বরের পর স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য হবে বলে আদেশে উল্লেখ আছে।

জানতে চাইলে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শাহিন-উল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাকে চসিক এখনো রিলিজ দেয়নি। তাই বদলি জায়গায় যোগদান করতে পারিনি। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বদলি আদেশে কিছু ভুল ছিল। তাই ওটা সংশোধন হয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আর সেই সংশোধিত অফিস আদেশে তো মাত্র আজকে এসেছে। তাই রিলিজ দিলে হয়তো আগামীকাল দিবে।’ তবে এখন পর্যন্ত তাঁর কাছে কোনো রিলিজ অর্ডার আসেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে শাহিন-উল ইসলাম চৌধুরীর জায়গায় পদায়ন হওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবুল কাশেমও চসিকে যোগদান করেননি। তিনি বলেন, ‘আমাকে কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। দুয়েকদিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে আমি যোগদান করছি।

সাময়িক বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার নিয়ে ‘লুকোচুরি’

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাতি নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে সমন্বয়কদের দাবির মুখে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল ঝুলন কুমার দাশকে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হয়েছে কী হয়নি, তা খোলাসা হয়নি। এ আদেশ প্রত্যাহার সংক্রান্ত বদলির আদেশের একদিন আগের তারিখে ২৫ সেপ্টেম্বরের একটি অফিস আদেশ পাওয়া গেছে। তবে সেটিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে ‘সমালোচনা’ শুরু হলে ২৯ সেপ্টেম্বর আরো একটি ‘প্রত্যাহার আদেশ’ প্রকাশ পায়। তবে সেটিতেও প্রধান নির্বাহীর সাক্ষর পাওয়া যায়নি। তিনি ঢাকায় অবস্থান করায় মন্ত্রণালয়ে বসেই স্বাক্ষর করে হাতেহাতে সেটি পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উল্টো প্রশ্ন করেন সেখানে তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে কিনা? তিনি বলেন, সেখানে কি আমার স্বাক্ষর আছে? আর আমি তো ঢাকায় আছি। এছাড়া সবকিছু আজকের (২৯ সেপ্টেম্বর) তারিখে করবো।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম এবং সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

প্রসঙ্গত, কোটা আন্দোলনের সময় ৩ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট ঝুলন কুমার দাশের নির্দেশনায় নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে সড়কবাতি নেভানো ছিল অভিযোগ করে তাঁকে বরখাস্তের দাবি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৪ আগস্ট বিকেলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে অফিস আদেশ জারি করেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর একই অভিযোগ এনে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তি। ওই মামলার ৩৯ নম্বর আসামি ঝুলন কুমার দাশ।

সূত্র—সিভি/এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ