চট্টগ্রাম বন্দরে বিপিসির আমদানি করা কোটি কোটি টাকার তেল চুরি হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চললেও বেশির ভাগ সময়ই তা ধরা পড়ে না। মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও শাস্তি হয় না জড়িতদের। অভিযোগ রয়েছে, বিপিসি ও চট্টগ্রাম বন্দরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কিছু সিবিএ নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে একটি চক্র তেল চুরির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপত্তিতে পড়েছেন অনেকেই।
মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে বহির্নোঙর পর্যন্ত জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল লোপাটে সংঘবদ্ধ চক্রটি জড়িত। তারা অয়েল ট্যাংকার থেকে কৌশলে আমদানি করা নানা ধরনের জ্বালানি তেল চুরি করছে। আর বিপিসি চুরি যাওয়া এই তেলকে অপারেশনাল বা ট্রানজিট লস হিসেবে দেখিয়েই সমন্বয় করছে। ছোট ছোট নৌকায় ড্রামে ভর্তি করে অনেকটা প্রকাশ্যেই জ্বালানি তেল চুরি হয়। বিপিসি ও চবকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে প্রতি বছর তেল চুরির পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে—বিদেশ থেকে আমদানি হয়ে আসা অয়েল ট্যাংকারে সার্ভে চালায় তেল কোম্পানির নিয়োজিত সার্ভে প্রতিষ্ঠান। এলসিতে উল্লিখিত পরিমাণ থেকে জ্বালানি তেল ভর্তি করা হয়। আর ওই তেলভর্তি কার্যক্রম চলার সময় চোর চক্র ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে ছোট ট্যাংকার থেকে তেল চুরি করে নিয়ে যায়।
আর চুরির সুযোগ করে দেয় ট্যাংকারের দায়িত্বে থাকা মাস্টার-সুকানিরা। কারণ ওসব তেল চুরিতে সমর্থন আছে বিপিসি ও তেল কোম্পানি ও চবকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরও। অভিযোগ আছে বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এক সিবিএ নেতার বিরুদ্ধেও। তারাও এই তেল চুরিতে ভূমিকা পালন করে।
সূত্র জানায়—দায়িত্বরত সার্ভে প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে আসা প্রতিটি অয়েল ট্যাংকারেই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল কম দেখায়। আর তা অপারেশনাল বা ট্রানজিট লস হিসেবে উল্লেখ করে সার্ভে প্রতিষ্ঠান। ওই সার্ভে প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজশ করে তেলের পরিমাণে নয়ছয় করে খোদ তেল কোম্পানির কর্মকর্তারাই।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা শাখা কিংবা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তথা তেল কোম্পানিগুলো ওই চুরি প্রতিরোধে কার্যত কোনো উদ্যোগই নেয় না। বরং অভিযোগ আছে বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং তেল কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তেল চুরিতে সক্রিয় সহযোগিতা করার। বিনিময়ে তারা মাসোয়ারা পেয়ে থাকে।
সূত্র আরো জানায়—বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকে প্রতি মাসে ডিজেল-ভর্তি ৮ থেকে ১০টি অয়েল ট্যাংকার আসে বন্দর বহির্নোঙওে আসে। প্রতিটি ট্যাংকারে জ্বালানি তেল থাকে ৩২ হাজার থেকে ৩৩ হাজার টন। প্রতি মাসে একটি অয়েল ট্যাংকার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রুড বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে আসে। আর প্রতিটি পরিশোধিত জ্বালানি তেলভর্তি অয়েল ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার থেকে ৩৩ হাজার টন।
আমদানি করা পরিশোধিত তেলবাহী অয়েল ট্যাংকারের ড্রাফট (পানির উপরের অংশ থেকে নিচের অংশ) থাকে ১২ থেকে ১৩ মিটার। তাই ওসব অয়েল ট্যাংকার সরাসরি বন্দরের ডলফিন অয়েল জেটিতে ভিড়তে পারে না। সেজন্য প্রথমে ছোট ছোট অয়েল লাইটার ট্যাংকারে করে বড় ট্যাংকার থেকে জ্বালানি তেল খালাস করা হয়। বড় ট্যাংকারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টনে কমিয়ে আনা হয়।
তারপর বড় অয়েল ট্যাংকারের সরাসরি ডলফিন অয়েল জেটিতে বার্থিং নেয়া হয়। ডলফিন অয়েল জেটি থেকে জ্বালানি তেল আনলোড করে তা সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় পতেঙ্গায় অবস্থিত জ্বালানি তেলের মূল স্থাপনায়। সেখান থেকে জ্বালানি তেল পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ডিপোগুলোয়। একইভাবে কুতুবদিয়ার কাছে গভীর সাগরে অবস্থানরত বৃহদাকার অয়েল ট্যাংকার থেকে ক্রুড লাইটারিং করার পর তা দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ট্যাংকে পাঠানো হয়।
বন্দরে জ্বালানি তেল চুরি প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যানসহ চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি তেলবাহী অয়েল ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার পর নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা সার্ভে করা হয়। আর সার্ভের মাধ্যমে ব্যাংকে খোলা ঋণপত্র বা এলসিতে উল্লিখিত পরিমাণ জ্বালানি তেল আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষা শেষে জাহাজে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল আছে ওই সংক্রান্ত প্রতিবেদন সার্ভে কোম্পার্নি বিপিসির কাছে দেয়। মূলত তেলের পরিমাণ জানতে মাপজোকেই চলে নানা দুর্নীতি। আমদানির চেয়ে পরিমাণে কম দেখিয়ে ওই জ্বালানি তেল ডিপো কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরিমাণে কম পাওয়ার বিষয়টিকে অপারেশনাল বা ট্রানজিট লস হিসেবে দেখানো হয়।
এসএস