কোথাও খাঁড়া! কোথাও টিলা! এসব পাহাড়ের চূঁড়া আর পাদদেশে সারি সারি ঘরবাড়ি। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে এই দৃশ্য চোখে পড়বেই। প্রতিবছরই পাহাড় ধসে সেই ঘরবাড়িতে বাস করা অনেকেই প্রাণ হারান। প্রাণ হারানো পর প্রশাসনের তোড়জোড়ও শুরু হয় তখন। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মানুষদের। কিন্তু বৃষ্টি থামলে আবারও সেই মানুষেরা ঘাঁটি গাড়েন সেই পাহাড়েই।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে চট্টগ্রামের ২৬টি পাহাড়ে এভাবে প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন ৬ হাজার ৫শ ৫৮টি পরিবারের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ১৬টি পাহাড় সরকারি সংস্থার। বাকি ১০টি পাহাড় ব্যক্তি মালিকানাধীন।
কোন পাহাড়ে কত বাসিন্দা
২৬টি পাহাড়ের মধ্যে সাতটি পাহাড় রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল) চট্টগ্রামের মালিকানাধীন। সেই পাহাড়গুলোর মধ্যে পলিটেকনিক হল্ট স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ১২টি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৫টি, ষোলশহর স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৭৪টি, ফয়স লেক এলাকার ১, ২, ৩ নম্বর ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে ৪ হাজার ৪শ ৭৬টি, মতিঝর্ণা ও বাটালী হিল সংলগ্ন পাহাড়ে ৪শ ৩১টি, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৬টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকাসংলগ্ন বিজয় নগর পাহাড়ে ২শ ৮৮টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর মালিকানাধীন বাটালী হিল ও মতিঝর্ণা অংশের পাহাড়ে বাস করছে ৮৮টি পরিবার। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন দুই পাহাড় ফিরোজ শাহ হাউজিং এস্টেট সংলগ্ন পাহাড় এবং কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেট সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে বাস করছে যথাক্রমে ৪৯ ও ১শ ৪৬টি পরিবার।
১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত তিন পাহাড়ের উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ১৫০ দাগের পাহাড়ে (জয়ন্তিকা আবাসিক সংলগ্ন) ২৮টি, বিএস ২১২ ও ২১৩ দাগের পাহাড়ে (মুরগি ফার্ম হয়ে গার্ডেন ভিউ সোসাইটি সংলগ্ন) ১২টি এবং আকবর শাহ বেলতলী পাহাড়ে ৮৯টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
অন্যদিকে, এপি ভুক্ত (পরিত্যক্ত সম্পত্তি) পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩টি এবং ভিপিভুক্ত (অর্পিত সম্পত্তি) লালখানবাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩শ ২৩টি পরিবার বসবাস করছে।
চট্টগ্রামের ২৬টি পাহাড়ে প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন ৬ হাজার ৫শ ৫৮টি পরিবারের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। বাকি ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ের মধ্যে হারুন খান সাহেবের পাহাড়ে ১শ ৪৪টি, নাছিয়াঘোনা এলাকার পাহাড়ে ১২টি, চিড়িয়াখানার পেছনের পাহাড়ে ২৮টি, মধুশাহ পাহাড়ে ২৯টি, জালালাবাদ সংলগ্ন পাহাড়ে ৫টি, নাগিন পাহাড়ে ২৫টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসংলগ্ন মীর মোহাম্মদ হাসানের পাহাড়ে ৩৮টি, এমআর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৪২টি, মিয়ার পাহাড়ে ৪৯টি এবং ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে (রৌফাবাদ, অক্সিজেন) ১১টি পরিবারের সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন।
বর্ষা এলেই তোড়জোড়
চট্টগ্রাম নগরে ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে মারা যান ১শ ২৭ জন। এর মধ্যে লালখানবাজার ওয়ার্ডের মতিঝরনা এলাকায় মারা গিয়েছিলেন ১১ জন। সেই ভয়াল ঘটনার পর ‘জন্ম’ হয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির। সেই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব ছিল বিশেষজ্ঞ কমিটির দেওয়া ৩৬ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- পাহাড় কাটা বন্ধ করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা। তবে অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা কমিটি কেবল বর্ষা এলেই সভা করে দায় সারে।
২০০৭ সালের পর থেকে প্রতিবছর বর্ষার আগে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে কিছু কাজও হয়। কিন্তু এরপর যেন দীর্ঘ ঘুমে চলে যায় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি! আর এই সুযোগে পাহাড়ে নতুন করে বসতি স্থাপন চলে।
সেই কাজে স্বয়ং সহযোগিতা করে সরকারি তিন সংস্থা চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঘুষের বিনিময়ে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পৌঁছে দেন। আর এই পাহাড়গুলোর বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন কাউন্সিলরসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফলে, প্রশাসন চাইলেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরাতে পারে না।
এখন বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনায় আবারও নড়েচড়ে বসেছে, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বৃহস্পতিবার (২০ জুন) অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পাহাড়ে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের যেসব অবৈধ সংযোগ রয়েছে, সবগুলো বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য দৃশ্যমান কিছু কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্যতম সদস্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের ২৬টি পাহাড়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছি। পাহাড় থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে ১০ একর খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
গত এক বছরে শুধু মহানগরে ৫১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেখান থেকে ১১টি পরিবারকে সরিয়ে আনা হয়েছে। ভবিষ্যতেও একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরাতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এসএস/এমএফ