ইঞ্জিন সংকট কাটাতে ৪০টি ব্রডগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কিনছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এতে সরকারের খরচ হবে ১ হাজার ১২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর মো. নূরুল ইসলাম সুজন এ সংক্রান্ত প্রথম কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এসব ইঞ্জিন ক্রয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম চালানের ৮টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। শনিবার (৬ মার্চ) সকাল থেকে বন্দরের বার্থে ট্রেনের ইঞ্জিন গুলো খালাস শুরু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মো. বোরহান উদ্দিন জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ আনা হচ্ছে। ৫ ধাপে এগুলো দেশে আসবে। তিনি জানান, প্রথম ধাপে ৮টি লোকোমোটিভ বন্দরে এসে পৌঁছেছে। ক্রেনের মাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে জাহাজ থেকে এগুলো নামানো হচ্ছে। এসব লোকোমোটিভ সরবরাহ করেছে আমেরিকান কোম্পানী মেসার্স প্রোগ্রেসিভ রেল ইউএসএ।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক তথ্য অফিসার জানান, সম্প্রতি রেল ভবনের সম্মেলন কক্ষে (যমুনা) ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়ের এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনসহ মন্ত্রণালয় ও ইঞ্জিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
গত ৫ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবের অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সরকার ও এডিবির যৌথ অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন (রোলিং স্টক সংগ্রহ) প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্রডগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ সংগ্রহের ক্রয় প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। লোাকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটে বহুদিন ধরেই ধুঁকছে রেল। ইঞ্জিনের অভাবে সিডিউল অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না রেলওয়ে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলওয়ের ২৮০টি ইঞ্জিনের (লোকোমোটিভ) মধ্যে অন্তত ১৯৫টির আয়ুষ্কাল বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। এতে করে চলন্ত অবস্থায় প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিনগুলো। এছাড়া ইঞ্জিন পুরনো হওয়ায় নির্ধারিত গতির চেয়ে অধিকাংশ ট্রেন চলছে কম গতিতে। এর ফলে ক্রমাগত সিডিউল বিপর্যয় ঘটায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা যায়, রেলওয়ের উন্নয়নে ৪৫টি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর একটি হল ৪০টি ব্রডগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ক্রয়। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, একটি ইঞ্জিনের ইকোনমিক লাইফ বা কার্যক্ষমতা থাকে ২০ বছর। ১৯৭৩ সালে কার্যক্ষমতা চলে গেলেও বেশিরভাগ ইঞ্জিন চলছে ৪৬ বছর ধরে। কেবল বি-১২ মডেলের ইঞ্জিন নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে বহরে মোট ২৭৩টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টি ইঞ্জিন এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। মাত্র ৭৮টি ইঞ্জিনের মেয়াদ আছে।
সূত্র জানায়, রেলের উন্নয়নে এখন ৪৮টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি প্রকল্প রেললাইন স্থাপন, সংস্কার, নতুন লাইন স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই সংক্রান্ত। বাকি পাঁচটি প্রকল্পে ইঞ্জিন কেনাসহ অন্যান্য উন্নয়নকাজ অন্তর্ভুক্ত।
২০১১-১৫ সালে রেলওয়ের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪৩ হাজার ৫৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় মূলত ঢাকা-মাওয়া-জাজিরা-ভাঙা রুটে ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ, এর সঙ্গে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রুটে ডুয়েল গেজ রেললাইন এবং ফৌজদারহাট-চট্টগ্রাম বন্দরে ডবল লাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জন্য।
এ ছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন পুনর্বাসন প্রকল্প, পার্বতীপুর-কাঞ্চন-পঞ্চগড় এবং কাঞ্চন-বরাই রুটে রেললাইন নির্মাণ এবং বিরল স্টেশন থেকে বিরল সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজে এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সেখানে ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা প্রাথমিকভাবে ছিল না। পরে ওই পরিকল্পনায় ইঞ্জিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা দিয়ে ৫৬টি ইঞ্জিন কেনা হয়।
২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ৬৬ হাজার ৩৩৭ কোটি ৭১ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪০টি নতুন ইঞ্জিন কেনা হবে। সূত্রমতে, একেকটি ইঞ্জিনের দাম ২৫ থেকে ৩০ কোটির টাকার মধ্য হবে।
সকালের-সময়/এমএফ