অভিযোগের পাহাড়—তবু অধরা কাজমী!


২৪ নভেম্বর, ২০২৪ ১২:৫৪ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার লতিফুল হক কাজমীর বিরুদ্ধে মিলেছে অভিযোগের পাহাড়। তার বিরুদ্ধে ফাইলে স্বাক্ষর না করায় পরিচ্ছন্নতা বিভাগের উপপ্রধান কর্মকর্তাকে অব্যাহতি, মশার ওষুধ ছিটাতে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার পরও কাজ না দেওয়া, শ্বশুরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ীকে মারধর ও কোরবানির বর্জ্য অপসারণে সর্বনিম্ন দরদাতার কার্যাদেশ বাতিলসহ নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

লতিফুল হক কাজমীকে সরানোর দাবিতে আন্দোলন করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন। তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে ৫ দিনের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল সম্প্রতি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের এক সদস্যও।

অভিযোগ রয়েছে, জরুরি (৭৬-ট) ফাইল দিয়ে খাল কাটার নামে যে পরিমাণ অর্থ চসিকের ফান্ড থেকে তিনি খরচ করেছেন সেই পরিমাণ মাটি উত্তোলন করলে শহরে মাটির পাহাড় হয়ে যেত। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সদস্য আবদুল বাতেন চৌধুরী দুদকে যে অভিযোগ করেছেন তাতে বলা আছে, ক্রয়-বিধির (পিপিআর) (৭৬-ট) ধারা ব্যবহার করে শতাধিক ফাইলের মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকার অনিয়ম করা হয়েছে। যার মধ্যে বেশকিছু ফাইলে ভুয়া কাজ দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে।

চসিকের কাজ না পাওয়া বেশ কয়েকজন ঠিকদারের অভিযোগ, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে উত্তোলিত বিলগুলো খতিয়ে দেখতে দুদকে অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সবচেয়ে বেশি কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, মেসার্স হাসবুন্নাল্লাহ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ইস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন, মেসার্স লায়লা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স কে আই বিল্ডার্স, মেসার্স এন এস ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স শিরোপা বিল্ডার্স ও মেসার্স ফাতিহা ইঞ্জিনিয়ারিং। মেসার্স ফাতিহা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মাহমুদুর রহমান গাজী তার ছোট বোনের স্বামী।

অভিযোগ রয়েছে, করপোরেশনের জন্য ৪০টি নতুন বর্জ্যবাহী কনটেইনার ক্রয়ে প্রতিটি সাড়ে ৩ লাখ টাকার স্থলে সাড়ে ৬ লাখ টাকা বিল করে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। ৬ হাজার টাকার হুইল ব্যারো ১০ হাজার টাকা ক্রয় দেখিয়ে ১ হাজারটি ক্রয়ে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীর ১৭নং বাকলিয়া ওয়ার্ডের ইকবাল খালের মাটি তোলার জন্য গত ২৯ এপ্রিল তিনটি লটে ঢাকার তেজগাঁও ৬৪/১ মণিপুরী পাড়ার ইয়াসিন ভবনের ঠিকানায় মেসার্স হাসবুন্নাল্লাহ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ৩২ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৭ টাকার কাজ দেওয়া হয়। নগরীর ৩৬নং গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের মহেশখালের সংযোগস্থল পর্যন্ত মাটি তোলার জন্য গত ২৯ এপ্রিল নগরের ৯৩, ডি টি রোড দেওয়ানহাট এলাকার সবুরা মনজিলের মেসার্স ইস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশনকে দুটি লটে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩ টাকার কাজ দেওয়া হয়।

২৮ এপ্রিল ২৭, শেখ মুজিব রোড আগ্রাবাদ ঠিকানায় মেসার্স লায়লা এন্টারপ্রাইজকে নগরের ৩৯ নং ওয়ার্ডের মাইট্যাল্লাহ খালের পূর্ব নাসিরাবাদ জাকির হোসেন রোডের শাহী জামে মসজিদ ঠিকানার মেসার্স কে আই বিল্ডার্সকে তিনটি লটে ৪২ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৫ টাকার কাজ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব কাজে কোনোটাতেই সঠিক পরিমাণ মাটি উত্তোলন করা হয়নি।

অব্যাহতি নিতে ৫ দিনের আলটিমেটাম তবুও বহাল

প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে গত ১৪ অক্টোবর ৫ দিনের সময় বেঁধে দেয় চসিক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন। সংগঠনের সভাপতি কাজী মো. আবু তৈয়ব ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুচ সবুর খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপরও বহাল তবিয়তে আছেন কাজমী।

তদন্ত ছাড়াই প্রকৌশলীকে অবমুক্ত

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ওই সময় সড়কবাতি নিভিয়ে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতার অভিযোগ এনে চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গত ১৪ আগস্ট প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কাজমীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকৌশলী ঝুলনকে অবমুক্ত করে অফিস আদেশ জারি করা হয়। অথচ অবমুক্ত করার আগে ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল।

ফাইলে স্বাক্ষর না করায় উপপ্রধান কর্মকর্তাকে অব্যাহতি

পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ৩৮টি ফাইলে স্বাক্ষর করেননি উপপ্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী। তার সন্দেহ ছিল ওই সব ফাইলে অনিয়ম করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে পরিচ্ছন্নতা বিভাগ থেকে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় অঞ্চল-১-এ বদলি করা হয়।

কার্যাদেশ দেওয়ার পরও কাজ দেননি

চসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গলমার্ক’কে কার্যাদেশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে ওষুধ সরবরাহ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মশক নিধন কর্মকর্তা কারাগারে গেলেও সে খবর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

নৌবাহিনীর পোষাক পড়ে ব্যবসায়ীকে মারধর

নগরীর আগ্রাবাদে অবস্থিত সিঙ্গাপুর ব্যাংকক মার্কেট কমিটির প্রচার সম্পাদক মনির হোসেন বাপ্পীকে গত ৬ এপ্রিল মার্কেটের ভেতর মারধর করা হয়। নৌবাহিনী পোশাক পরিহিত অবস্থায় ব্যবসায়ীকে মারধরের ওই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। মূলত প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার শ্বশুরের দোকান সংক্রান্ত বিষয়ে ওই ব্যবসায়ীকে মারধর করা হয়।

২০২৪ সালে পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির দিন ১১০টি আবর্জনাবাহী ট্রাক সংগ্রহের দরপত্রে সর্বনিম্নদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। ওই ঠিকাদারকে সুকৌশলে বাদ দিয়ে মেসার্স শিরোপা বিল্ডার্স নামে চকবাজারের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়। এতে চসিক প্রায় ১০ লাখ টাকা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লতিফুল হক কাজমী বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, চসিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন বলে সংযোগ বিছিন্ন করে দেন।

বিষয়ে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

সূত্র—কেকে/এসএস/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ