বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুটি দল এ মুহূর্তে আত্মবিশ্বাসের নিরিখে রয়েছে বিপরীত মেরুতে। সদ্য সমাপ্ত টি২০ বিশ্বকাপে সুপার টুয়েলভ রাউন্ডে একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠা পাকিস্তান শেষ চারে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। বিশ্বকাপ যাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ হলেও বাবর আজমদের আত্মবিশ্বাস এ মুহূর্তে তুঙ্গে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেটে চলছে ক্রান্তিকাল। একঝাঁক তরুণে গড়া বাংলাদেশ তাই পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি২০ সিরিজে অগ্নিপরীক্ষার মুখেই পড়ছে। আজ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বেলা ২টায় শুরু হবে সিরিজের প্রথম ম্যাচ।
বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে নিয়ে সতর্কই থাকতে হবে পাকিস্তানকে। কেননা ঘরের মাঠে টাইগাররা বেশ কয়েক বছর ধরেই কর্তৃত্ব করে আসছে। বিশ্বকাপের আগে টানা দুটি সিরিজে তারা হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে। যদিও আরব আমিরাতে সুপার টুয়েলভ রাউন্ডে মাহমুদউল্লাহর দল একটি ম্যাচেও জিততে পারেনি।
বিশ্বকাপে অনবদ্য পারফর্ম করা পাকিস্তান ক্রিকেট দল সেই আগুন ফর্ম বাংলাদেশেও ধরে রাখতে চাইবে। তাদের ব্যাটিং লাইন-আপ বিভিন্ন কন্ডিশনে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং একাধিকবার তারা সেটি প্রমাণও করেছে। বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ান পাকিস্তান ব্যাটিং ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আর শোয়েব মালিক ও ফখর জামান গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের স্কোরবোর্ডে অবদান রাখছেন। শাদাব খান ও মোহাম্মদ নওয়াজ স্পিনিং অলরাউন্ডার এবং শেষ দিকে ব্যাটিং করেন। যদিও ঢাকার স্লো উইকেটে এ দুজনের স্পিন বল বেশ কার্যকর হতে পারে।
ঢাকার উইকেটে শাহীন শাহ আফ্রিদির প্রথম স্পেলে চোখ থাকবে সবার। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করা শেষ ওভারটি ছাড়া গোটা টুর্নামেন্ট দুর্দান্ত কেটেছে তার, ছয় ম্যাচে নিয়েছেন সাত উইকেট। হারিস রউফ ও হাসান আলীর কাছ থেকে বাড়তি গতি পাচ্ছে পাকিস্তান। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ক্যাচ ছেড়ে সমালোচনার মুখে পড়া হাসান আলী বাংলাদেশ সিরিজে নিজেকে প্রমাণে মরিয়া হবেন নিশ্চিত।
বাংলাদেশ মাঠে নামাচ্ছে একটি অনভিজ্ঞ দল। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও সাইফউদ্দিনের মতো সিনিয়ররা না থাকায় দলে সুযোগ পেয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, সাইফ হাসান ও ইয়াসির আলী চৌধুরী। তারা তিনজনই ঘরোয়া টি২০ লিগে ভালো পারফর্ম করে দলে জায়গা পেয়েছেন। আজ অভিষেক ঘটতে পারে সাইফ ও ইয়াসিরের। নির্বাচকরা দলে ডেকেছেন লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, পেস বোলার শহীদুল ইসলাম ও উইকেটকিপার আকবর আলীকে। যদিও এ তিনজনকেই ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে দলে রাখা হয়েছে।
১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দলে সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখ এখন মাহমুদউল্লাহ। দলে সিনিয়রদের অনুপস্থিতিতে ব্যাটিংয়ে নিজের ভূমিকাও বেশ পাল্টে যাবে মাহমুদউল্লাহর। ফিনিশার হিসেবে এতদিন ভূমিকা পালন করে এলেও এখন হয়তো তাকে দেখা যাবে মিডল অর্ডার অ্যাংকরের ভূমিকায়। পাওয়ার প্লেতে নিজের ব্যাটিং কৌশল পাল্টে আগ্রাসী হতে পারেন মোহাম্মদ নাইম। এদিকে বিশ্বকাপে খারাপ ফর্ম করে চাপে থাকা আফিফ হোসেন ও নুরুল হাসান সোহানকে জ্বলে উঠতে হবে।
ঘরের মাঠে সবসময়ের মতো এবারো স্পিন বোলিং আক্রমণ প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের। সাকিবের অনুপস্থিতিতে মেহেদী হাসান ও নাসুম আহমেদের কাঁধেই থাকছে ঘূর্ণি বোলিংয়ের দায়িত্ব। এদিকে পেস বোলিংয়ের নেতৃত্বে মুস্তাফিজুর রহমানকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন তাসকিন আহমেদ, যিনি বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ৬.৫০ ইকোনমি রেটে ছয় উইকেট শিকার করেছেন। যদিও সাত ব্যাটার খেলানোয় ২০ ওভার পূর্ণ করাও কঠিন চ্যালেঞ্জের হয়ে উঠবে স্বাগতিকদের জন্য।
বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের নাম ক্যাচিং। বিশ্বকাপে ১১টি ম্যাচ ছেড়েছেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। এ ব্যর্থতায় এরই মধ্যে ফিল্ডিং কোচ রায়ান কুককে ছাঁটাই করেছে বিসিবি। এ সিরিজ সামনে রেখে তাই অনুশীলনে ক্যাচিংয়েই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর এ সিরিজে নিজেদের ওপর সবার প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলনায়ক মাহমুদউল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই বিশ্বকাপের পর এ সিরিজে ভালো খেলাটা আমাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়ার একটা সুযোগও। তবে পাকিস্তান এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল আর আমাদের তো অনেক নতুন খেলোয়াড় সুযোগ পেয়েছে। এটা আমাদের জন্য খুব কঠিন হবে।
টি২০ বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে সমালোচিত হয় বাংলাদেশ দল। যদিও খারাপ সময়ে ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগেও নানা সময় ক্রিকেটারদের পাশে থেকেছেন শেখ হাসিনা। বুধবার সরকারপ্রধানের সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা ক্রিকেট নিয়ে বক্তব্য শুনেছেন ও দেখেছেন মাহমুদউল্লাহ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের আগের দিন গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের টি২০ অধিনায়ক বললেন, প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় পাশে পাওয়া তাদের জন্য অভাবনীয়। তার কথায়, এটা আমি শুনেছি ও দেখেছি। প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তার কথা আমাদের আরো অনেক অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের দলের জন্য এটা অনেক ইতিবাচক একটা কথা।
স্পিনে আশা বাংলাদেশের, আবার স্পিনেই শঙ্কা। পাকিস্তানের সহঅধিনায়ক শাদাব খান বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে চার উইকেট তুলে নিয়ে দলকে প্রায় ফাইনালে তুলে নিচ্ছিলেন। এছাড়া বিশ্বকাপে শুধু একবারই তিনি ত্রিশের বেশি রান দিয়েছেন। লেগ স্পিনে বরাবরই দুর্বল বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারেন শাদাব খান।
আসিফ আলী ও ইমাদ ওয়াসিমকে বিশ্রাম দেয়ায় পাকিস্তান দলে সুযোগ পেয়েছেন হায়দার আলী ও খুশদিল শাহ। সুযোগ মিলেছে মোহাম্মদ নওয়াজের। তৃতীয় পেসার হিসেবে হাসান আলী ও ওয়াসিম জুনিয়রের মধ্যে একজন একাদশে থাকবেন।
প্রথম টি২০ সামনে রেখে আলোচনায় মিরপুরের উইকেট। চলতি বছর এখানে আগে ব্যাটিং করা দল গড়ে ১১৯ রান তুলতে সমর্থ হয়েছে। যদিও আগের ১০ বছর ধরে এখানে গড় রান ছিল ১৫২। গত দুই মাসে মাঠে কিছুটা কাজ করায় এখন উইকেটে আরেকটু বেশি রান উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উইকেট নিয়ে মাহমুদউল্লাহ বললেন, উইকেট দেখে খুব ভালো মনে হলো। আশা করি, এটা ভালো উইকেট হবে।
ঘরের মাঠে সর্বশেষ মুখোমুখিতে দুটি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের সিরিজে একমাত্র ম্যাচে এবং ২০১৬ সালের এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারায় বাংলাদেশ। এরপর কলকাতা ও লাহোরে তিন দেখায় তিনবারই জিতেছে পাকিস্তান। সব মিলিয়ে ১২ বারের মুখোমুখিতে ওই দুবারই জিততে পেরেছে বাংলাদেশ, বাকি ১০টিতে জিতেছে পাকিস্তান।
সকালের-সময়