জাল দলিলে জমি আত্মসাত, প্রতারক কারাগারে


৬ জানুয়ারি, ২০২২ ১০:০৯ : পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম আনোয়ারার বৈরাগ মুহাম্মদপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম ওরফে টাউট তেইন্যা। তিনি বহু মাত্রিক অপরাধের জনক। জাল দলিল তৈরি করে জমি আত্মসাতের অভিযোগে অবশেষে গেলেন জেল হাজতে। গত ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কামরুন্নাহার রুমির আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন নিতে গেলে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে প্রেরনের আদেশ দেন। তবে এসময় আদালত তার পুত্র ফোরকানকে জামিন দিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত দায়রা জজ এম ছমিউদ্দীন নরুল ইসলাম ওরপে টাউট তেইন্যার জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে। এর আগে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩ দফা জামিন আবেদন না মঞ্জুর করা হয় বলে আদালত সূত্রে জানায়।

জানা যায়, ভুয়া কবলা তৈরী করে মৃত মানুষকে জীবিত দেখিয়ে জমি-টাকা আত্মসাত করার চেষ্টার অভিযোগে গত ২ ডিসেম্বর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) এ’দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। যার নং-২৬৭

টাউট তেইন্যা ২৪ ঘন্টার মধ্যই যেই কাউকে টাকার বিনিময়ে জাল সনদ, ভুয়া কবলা তৈরী করে দিতো। দীর্ঘ ১০ বছরের অধিক সময় চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে আস্তানা গেড়ে নানা অপরাধ ও প্রতারনামুলক কর্মকান্ড করে আসছিল সেই। তার অভিনব প্রতারনার শিকার হন স্থানীয় দানা মিয়ার পরিবার। এই পরিবারের অন্তত ৫০ লক্ষ টাকার অধিক টাকা আত্মসাত করে বলে অভিযোগ উঠেছে তেইন্যা পুত্র ফোরকানসহ একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

আনোয়ারার বেলচুড়া মৌজার আরএস ১৪৪০ ও ১৮৬৭ দাগের মোট ৮গন্ডা জমির ৪৯ নম্বর জাল কবলাটি ভুক্তভোগীর হাতে আসার পর মামলার সিদ্বান্ত নেয় পরিবারটি। চলতি বছরের ৩ অক্টোবর মাসে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের সিনিয়র বিচারক কৌশিক আহমদ খন্দকার এর আদালতে মামলাটি দায়ের করেন সাংবাদিক আহমদ কবিরের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট মোঃ শাহাবুদ্দীন আহমদ।

এতে আসামী করা হয় নুরুল ইসলাম ওরফে টাউট তেইন্যা ও তার পুত্র মোঃ ফোরকান উর রশিদসহ অজ্ঞাত আরও ৪/৫জনকে। ৪২০/ ৪৬৭/ ৪৬৮/ ৪৭১/ ৫০৬ (২) ১০৯ পেনাল কোড অনুযায়ী মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালত এসময় মামলাটি সরাসরি আমলে নিয়ে আনোয়ারা থানার ওসিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নির্দেশ প্রদান করে।

একই সাথে নালিশী অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত পুর্বক আগামী ৬/১২/২১ ইং তারিখের পুর্বে একটি গ্রহণ যোগ্য বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন এই আদালতে প্রেরন করতে পুলিশ সুপার পিবিআই চট্টগ্রামকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই সাথে আদালত উক্ত অভিযোগের ফটোকপিসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের ফটোকপি আদালতে সংরক্ষন করতে বেঞ্চ সহকারীকেও নির্দেশ দেন আদালত।

তদন্তে পিবিআই

পুলিশ ব্যুারো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) মামলার নথি হাতে আসার পর পুলিশ সুপার পিবিআই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশ পরিদর্শক (প্রশাসন) কাজী এনায়েত কবীর এর হাতে। তিনি মামলার কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর দ্রুত তদন্তে নেমে পড়েন। গত ১৩ অক্টোবর ঘটনাস্থল মুহাম্মদপুর (বেলচুড়া) গ্রাম পরিদর্শনে আসেন তিনি। সাথে এসআই রাজু বড়ুয়া এএসআই তারিখ আহমদ সড়কে দাঁড়িয়ে চলাচলরত সাধারণ মানুষের কাছে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং আসামীদ্বয়ের চারিত্রিক কেমন তাও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

স্থানীয়রা এসময় তদন্তদলকে বলেছেন, তেইন্যা ও তার পুত্র ফোরকান চিটিং প্রতারক, পেশা হচ্ছে প্রতারনা করা। জমিটিও তাদের নয়, দখলেও নেই বলে জানায় স্থানীয়রা। তদন্তকারী দলটি ঘটনাস্থল মুহাম্মদপুর আসার পুর্বে চট্টগ্রাম আদালতের রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের রেকর্ড রুমেও যান। বিগত ২৫/১/৭৫ সালের দেখানো ৪৯ নম্বর কবলার সহি মুহরির নকল নবিশ মাবিয়া খাতুন ও তুলনাকারী আমেনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

কবলার নকলটি তাদের লিখিত নয় বলে জানায় পিবিআই’র তদন্ত দলকে। এরপর তদন্তকারী দল দেখানো ওই কবলার একটি নকল কপিও সংগ্রহ করা হয়। নকল কপির তফসিল, ঠিকানা দাতা গ্রহিতা লিখক ভিন্ন ভিন্ন পাওয়া যায় বলে জানায় তদন্তকারী দল পিবিআই। যা তেইন্যার দেখানো কবলার সাথে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গা ঢাকা দেয় বাপ-বেটা

তেইন্যা ও তার পুত্র ফোরকান মামলার খবর জানার পরপরই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই মামলায় হাইকোট থেকে ৬ সপ্তাহ’র জন্য জামিন লাভ করে তারা। তবে জামিন লাভ করলেও কথিত ঘটনা প্রমানের জন্য কারসাজির মাধ্যমে সাক্ষীদের কোনো প্রলোভন বা হুমকি প্রদান করতে পারবেনা বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।

বাদী পক্ষের অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর থেকে আসামীরা সাক্ষীদের ঘরে ঘরে, অফিসে গিয়ে মামলা তুলে নিতে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে আসছে। এঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে গত ১৭ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী নং- ৬৯৩ দায়ের করা হয়।

আদালতে চার্জশিট দাখিল

দীর্ঘ কয়েক মাস তদন্ত শেষে গত ২ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন পিবিআই। আসামী করা হয় বাপ-বেটাকে। যার অভিযোপত্র হচ্ছে ২৬৭। তদন্তে ৪০৬ নম্বর ধারাটি সংযুক্ত করা হয়। ধারাটি এজাহারে ছিলনা। তদন্তে এই ধারার অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় চার্জশিটে সংযুক্ত করা হয় বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী এনায়েত কবীর।

তিনি বলেছেন, মামলার গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য স্থানীয় চাতরী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ ইয়াছিন হিরু ও বৈরাগ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ সোলায়মানকে সাক্ষ্যি হিসেবে রাখা হয়েছে।

এছাড়া এই দুই ইউপি চেয়ারম্যান লিখিত বক্তব্যও দিয়েছেন। দুই আসামীর বিরুদ্ধে জাল দলিল সৃজন করে জমি গ্রাস টাকা আত্মসাত এর অভিযোগ যথাযত প্রমানিত হয়েছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তার দেয়া চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। দুই আসামীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আদালতে বিচার শুরুর দাবীও জানানো হয়েছে চার্জশিটে।

এদিকে পুলিশ আরও দুই দফা অভিযান পরিচালনা করে চট্টগ্রাম নগরীর কোরবানীগঞ্জ ও জেলার আনোয়ারায়। ২০১৮সালের ৮ নভেম্বর নগর গোয়েন্দা পুলিশ কোরবানীগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে হারুন অর রশীদ জুনু নামে এক জাল কবলা তৈরীর কারিগরকে গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমান ষ্ট্যাম্প, জাল দলিল তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারী আনোয়ারা উপজেলার হেটিখাইন গ্রাম থেকে জাল দলিল তৈরীর অন্যতম হোতা আবদুল ছালাম সহযোগী লোকমান ও আইয়ুব আলীকে গ্রেফতার করা হয়। তারাও তেইন্যার সহযোগি বলে অপর একটি সুত্র জানায়।

উল্লেখ্য যে, নুরুল ইসলাম প্রকাশ টাউট তেইন্যা পিতা- মৃত ফজর রহমান সাং- বৈরাগ মুহাম্মদপুর আনোয়ারা চট্টগ্রাম, প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডিও পার হতে পারে নি বলে জানায় নির্ভরযোগ্য সূত্র।

এসএস

0Shares

আরো সংবাদ